আসানসোলের রবীন্দ্র ভবনে গতকাল বর্ণাঢ্য আয়োজনে পালিত হল সাঁওতালি ভাষার অলচিকি লিপির প্রবর্তক পন্ডিত রঘুনাথ মুর্মুর ১২০তম জন্মদিবস। আদিবাসী স্টুডেন্টস অ্যান্ড ইয়ুথ ফোরামের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ পন্ডিত মুর্মুর মূর্তিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। নাচ, গান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এই দিনটি উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হয়।

বক্তব্য রাখছেন আদিবাসী নেতা হীরালাল সরেন ফটো নিজস্ব
অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আদিবাসী নেতা হীরালাল সরেন। তিনি তাঁর বক্তৃতায় পন্ডিত রঘুনাথ মুর্মুর জীবন ও কর্মের উপর আলোকপাত করেন। হীরালাল সরেন বলেন,
“পন্ডিত রঘুনাথ মুর্মু আমাদের আদিবাসী সমাজের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি শুধু অলচিকি লিপির স্রষ্টাই নন, তিনি আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয়কে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছেন। তাঁর হাত ধরে সাঁওতালি ভাষা একটি নিজস্ব লিখিত রূপ পেয়েছে, যা আমাদের শিক্ষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত খুলেছে। তাঁর জীবন আমাদের কাছে এক অনুপ্রেরণা, যিনি সীমিত সম্পদ নিয়েও সমাজের উন্নতির জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন।”
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আদিবাসী সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং ছাত্র-যুবকেরা। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সাঁওতালি নৃত্য ও গান পরিবেশন করা হয়, যা দর্শকদের মন জয় করে। পন্ডিত মুর্মুর লেখা কবিতা ও নাটকের কিছু অংশও পাঠ করা হয়, যা তাঁর সাহিত্যকর্মের গভীরতা তুলে ধরে।
পন্ডিত রঘুনাথ মুর্মু ১৯০৫ সালের ৫ মে ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলার ডহরাডিহি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯২৫ সালে অলচিকি লিপি উদ্ভাবন করেন, যা সাঁওতালি ভাষাকে একটি নিজস্ব লিখিত রূপ প্রদান করে। এছাড়াও তিনি অসংখ্য নাটক, কবিতা, গান ও শিশুসাহিত্য রচনা করেছেন, যা আদিবাসী সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ। তাঁর অবদানের জন্য তিনি ‘গুরু গোমকে’ নামে সম্মানিত হন। ১৯৭৭ সালে তিনি ঝাড়গ্রামে একটি সাঁওতালি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং রাঁচির ধুমকুরিয়া কর্তৃক ডি.লিট উপাধিতে ভূষিত হন।
আদিবাসী স্টুডেন্টস অ্যান্ড ইয়ুথ ফোরামের এক সদস্য জানান, “এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমরা পন্ডিত রঘুনাথ মুর্মুর আদর্শকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে চাই। তাঁর স্বপ্ন ছিল আদিবাসী শিশুরা নিজস্ব ভাষা ও লিপিতে শিক্ষা গ্রহণ করুক, আর সেই স্বপ্নকে আমরা বাস্তবায়িত করতে কাজ করে যাচ্ছি।”
অনুষ্ঠান শেষে সকলে পন্ডিত মুর্মুর আদর্শ অনুসরণ করে আদিবাসী সমাজের শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রসারে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এই জন্মদিবস উৎসব আসানসোলের আদিবাসী সম্প্রদায়ের ঐক্য ও সাংস্কৃতিক গরিমার এক জ্বলন্ত প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *