বাংলার জাগরণ ডট কম সংবাদদাতা

মুর্শিদাবাদের কর্ণসুবর্ণ ও গোবিন্দপুর স্টেশনের মাঝামাঝি রেল লেভেল ক্রসিংয়ে শুক্রবার সকালে ঘটে গেল এক হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা। খোলা রেলগেট দিয়ে স্কুলভ্যান পার হওয়ার সময় নিমতিতা-কাটোয়া লোকাল ট্রেনের ধাক্কায় মৃত্যু হয়েছে তিন স্কুলপড়ুয়া-সহ মোট চার জনের। আহত হয়েছেন আরও পাঁচ জন। তাঁদের মধ্যে দু’জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আহতদের মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

Murshidabad Train Tragedy: 4 Dead, Including 3 Schoolchildren | Gatekeeper Suspended | Breaking News

প্রাথমিক তদন্তে পূর্ব রেল জানিয়েছে, দুর্ঘটনার সময় রেল সিগন্যালিং ব্যবস্থায় কোনও ত্রুটি ছিল না। নির্ধারিত সিগন্যাল মেনেই ট্রেনটি চলছিল। ফলে তদন্তের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে লেভেল ক্রসিংয়ের দায়িত্বে থাকা গেটম্যান অনুপ কর্মকারের ভূমিকা। ইতিমধ্যেই তাঁকে এবং তাঁর বিভাগীয় সুপারভাইজারকে সাসপেন্ড করেছে রেল কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি কর্তব্যে গাফিলতির অভিযোগে গেটম্যানকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে বহরমপুর থানার পুলিশ।

মুর্শিদাবাদ পুলিশ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হেডকোয়ার্টার) অভিষেক যাদব জানান, প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান রেকর্ড করা হয়েছে এবং স্কুলভ্যানের চালকের সঙ্গেও কথা বলা হয়েছে। রেলের সঙ্গে যৌথভাবে তদন্ত চলছে। প্রয়োজনে অভিযুক্ত গেটম্যানকে গ্রেফতার করা হবে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, হাওড়াগামী নবদ্বীপ এক্সপ্রেস আপ লাইন দিয়ে চলে যাওয়ার পর রেলগেট খুলে দেওয়া হলেও সেখানে কোনও গেটম্যান উপস্থিত ছিলেন না। গেট খোলা দেখে স্কুলভ্যান-সহ একাধিক গাড়ি রেললাইন পার হতে শুরু করে। ঠিক সেই সময় ডাউন লাইনে দ্রুতগতিতে চলে আসে নিমতিতা-কাটোয়া লোকাল। বিপদ বুঝে শেষ মুহূর্তে গেট নামানোর চেষ্টা হলেও ততক্ষণে স্কুলভ্যানটি লাইনের মাঝখানে আটকে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে ট্রেনের ধাক্কায় দুমড়েমুচড়ে যায় গাড়িটি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, অভিযুক্ত গেটম্যান দীর্ঘদিন ধরেই দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা করতেন। তাঁদের দাবি, তিনি প্রায়ই মদ ও গাঁজার নেশায় ডিউটিতে থাকতেন এবং সময়মতো গেট পরিচালনা করতেন না। এমন অভিযোগে অতীতেও রেল কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার জানানো হলেও কোনও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী। তবে এই অভিযোগগুলির এখনও সরকারি বা তদন্তকারী সংস্থার পক্ষ থেকে নিশ্চিত প্রমাণ মেলেনি।

ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে পূর্ব রেল হাওড়া ডিভিশনের এডিআরএম-এর নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্তকারী দল ঘটনাস্থলে পাঠিয়েছে। পাশাপাশি আহতদের চিকিৎসার জন্য রেলের বিশেষ মেডিক্যাল টিমও মোতায়েন করা হয়েছে। রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যাত্রী নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি মেনে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে এই দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক তরজাও শুরু হয়েছে। রাজ্যের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল বলেন, পূর্ববর্তী সরকারের সময় বহু জায়গায় রেল ওভারব্রিজ বা আন্ডারপাস নির্মাণে বাধা দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে এখনও বহু লেভেল ক্রসিং ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তাঁর দাবি, বর্তমানে বিজেপি সরকার উন্নয়নের গতি বাড়াতে রেলকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করছে এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে পরিকাঠামোগত উন্নয়নে জোর দেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, বাংলার মানুষের স্বার্থে উন্নয়নমূলক কাজে রাজ্য সরকারের পূর্ণ সহযোগিতা থাকবে।

এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে গোটা এলাকায়। মৃতদের পরিবারে চলছে কান্নার রোল। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, সময়মতো সতর্কতা ও দায়িত্বশীলতা থাকলে কি এই দুর্ঘটনা এড়ানো যেত? সেই উত্তর খুঁজতেই এখন রেল ও পুলিশের পৃথক তদন্ত চলছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *